ধরুন আপনি একটি বড় ধরনের কোম্পানীর একজন নির্বাহী। আপনার প্রধান দায়িত্ব হল আপনার অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কার্য/দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য সঠিক হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারটি নিশ্চিত করা। একটি কম্পিউটার কিনে ফেলাই সব নয় আপনাকে সফটওয়্যার অথবা সফটওয়্যার লাইসেন্স কিনতে হবে যা আপনার অফিস কর্মীদের প্রয়োজন তার ব্যবস্থা করতে হবে। যখন নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে তখন আপনাকে তার জন্য সফটওয়্যারের ব্যবস্থা করতে হবে বা ব্যবহৃত সফটওয়্যার এর লাইসেন্স আরও ইউজার অন্তর্ভুক্ত করা যাবে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এটা এত চাপ যে, বিপুল পরিমাণ কর্মের বোঝা কাধে নিয়ে রাতে ঘুমাতে যাওয়াটাও কঠিন।
এত কিছুর বদলে যেখানে আপনার মতই নির্বাহীর বিকল্প কিছু হতে পারে। প্রত্যেকটি কম্পিউটারে গাদাখানেক সফটওয়্যার ইনস্টল করার পরিবর্তে আপনাকে একটি অ্যাপ্লিকেশন লোড করতে হবে। ঐ অ্যাপ্লিকেশন আপনার সমস্ত কর্মীদের একটি ওয়েব বেজড্ সার্ভিসে লগইন করতে দিবে যেখানে কর্মীদের দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রোগ্রাম হোস্ট করা থাকবে। দূরবর্তী যে সব মেশিনে সার্ভিসগুলো রান করে তা অন্য একটি কোম্পানীর মালিকানা বা দায়িত্বে থাকবে, যেখানে ইমেইল থেকে শুরু করে ওয়ার্ড প্রসেসর সহ জটিল অ্যানালাইস প্রোগ্রাম অন্তর্গত থাকবে। ঐ কোম্পানী এ সব প্রোগ্রাম, সফটওয়্যার ও ডেটার নিরাপত্তা ও স্থায়ীত্ব মালিকানা ভিত্তিতে সংরক্ষণ ও নিশ্চয়তা দিবে। এই বিশেষ ব্যবস্থাকে বলা হয় ক্লাউড কম্পিউটিং।
ক্লাউড কম্পিউটিং কি
ক্লাউড কম্পিউটিং এমন একটি প্রযুক্তি যা ইন্টারনেট এবং দূরবর্তী কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবস্থার মাধ্যমে ডেটা এবং অ্যাপ্লিকেশন সংরক্ষণ করে। ক্লাউড কম্পিউটিং ভোক্তাদের কে কোন ইনস্টলেশন ছাড়াই অ্যাপ্লিকেশন সমূহ ব্যবহারের সুযোগ করে দেয় এবং ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি আছে এমন কম্পিউটার থেকে তাদের ব্যক্তিগত ফাইল এক্সেসের সুবিধা দেয়। ক্লাউড কম্পিউটিং এর সহজ উদাহরণ হল Yahoo, Gmail, Google, Hotmail ইত্যাদি। একটি ইন্টারনেট কানেকশনের দরকার হবে, ব্যাস আপনি ইমেইল থেকে শুরু করে ডকস্, নিউজ, স্টোরেজ প্রভৃতি সার্ভিস অনায়েসে ব্যবহার শুরু করতে পারেন। এই সার্ভার মেশিন ও অ্যাপ্লিকেশনগুলো ইন্টারনেট ভিত্তিক ক্লাউডে রাখা থাকে এবং ক্লাউড সার্ভিস প্রদানকারীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও সংরক্ষিত থাকে। ভোক্তারা এককভাবে এবং নিজে নিজেই সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করতে পারে এবং সুবিধাগুলো দ্বারা উপকৃত হতে পারে।

একটি সাধারণ ভাবনা হল এরকম যে, যদি আপনার খাবার প্রয়োজন দুধ দরকার হয় তবে আপনি কি একটি গরু কিনে আনবেন? এরকমই সফটওয়্যার এর সুবিধা পাওয়ার জন্য আপনি শুধু সার্ভিসটিই নিবেন আপনাকে পুরো সফটওয়্যারটি কিনতে অথবা ইনস্টল করতে হবে না। ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে কিছু বিশেষায়িত ওয়ার্কলোড (কার্যচাপ) এর স্তর আছে। এখানে লোকাল কম্পিউটারের প্রসেসর বা মেমোরীকে কোন অ্যাপ্লিকেশন রান করার জন্য কোন অতিরিক্ত লোড নিতে হয় না। যে কম্পিউটারাইজ্ড নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্লাউড তৈরী হয় সে এটা পুষিয়ে নেয়। ব্যবহারকারীদের দিক থেকে হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার চাহিদা কমে যায়। ব্যবহারকারীদের কম্পিউটারে শুধু ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেম ইন্টারফেসটি কোন সাধারণ ওয়েব ব্রাউজারের মাধ্যমে রান করার ব্যবস্থা/উপযোগী থাকতে হয় আর বাদ বাকী সব রান করার দায়িত্ব ক্লাউড নেটওয়ার্কের।
যেভাবে কাজ করে ক্লাউড কম্পিউটিং
ক্লাউড কম্পিউটিং এর কথা বলতে গেলে আমরা এক প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি একটি ফ্রন্ট এন্ড আরেকটি ব্যাক এন্ড যারা একে অন্যে সাথে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত। মূলত ইন্টারনেটের দ্বারা ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে ফ্রন্ট এন্ড বলতে সাধারণত ইউজারের কম্পিউটারে যে ইন্টারফেসটা দেখ যায় যেটা দিয়ে ইউজার ক্লাউড কম্পিউটিং এ সুবিধাগুলো ব্যবহার করে। এটা ওয়াবে বেইজ কিংবা ডেস্কটপ বেইজ হতে পারে। আর ব্যাক এন্ডটাই হল এই ব্যবস্থার মূল ক্লাউড। ব্যাক এন্ড এর আলোচনার অংশটি বিশাল, সেখানে যাবার আগে ফ্রন্ট এন্ড নিয়ে সামান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করি।
ফ্রন্ট এন্ড এর অংশ হিসেবে ক্লায়েন্ট এর কম্পিউটার, ক্লায়েন্টের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ক্লাউড এক্সেস করতে যে অ্যাপ্লিকেশন গুলো প্রয়োজন তা অন্তর্গত। সব ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমের ইন্টারফেস একরকম নয়। ওয়েব বেইজ ইমেইল প্রোগ্রামগুলো সাধারণ ওয়েব ব্রাউজার যেমন ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার, ফায়ার ফক্স দিয়েই কাজ করে তেমনি অন্যান্য অনেক ক্লাউড সার্ভিসের আলাদা নিজস্ব অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে যা দিয়ে ক্লায়েন্ট তার ক্লাউড নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে। এদিকে ক্লাউড ব্যবস্থার ব্যাক এন্ডটি বিভিন্ন মাত্রার কম্পিউটার, সার্ভার, ডেটা স্টোরেজ এ নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে সংযুক্ত যা কম্পিউটিং সার্ভিসের ক্লাউডটি তৈরি করে। তত্ত্বীয়ভাবে ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে বাস্তব ব্যবহারযোগ্য ডেটা প্রসেসর থেকে ভিডিও গেমস, যে কোন প্রোগ্রাম বা অ্যাপ্লিকেশনেই থাকতে পারে। এই ক্লাউড ব্যাক এন্ড ইন্ফ্রাস্ট্রাকচারকে তিনটি অংশে কার্য সম্পাদন করতে দেখা যায়- ইউজারকে ফ্রন্ট এন্ড সাপোর্ট দেয়ায় ভূমিকা রাখে অ্যাপ্লিকেশন, সমস্ত ডেটা সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকে স্টোরেজ সার্ভার সমূহ এবং এ সমস্ত কিছু কানক্টিভিটির দায়িত্বে আছে নেটওয়ার্ক বিভাগ। প্রতিটি অংশেরই ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনীয় দায়িত্ব রয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন প্রোডাক্ট অফার করে।
একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার পুরো সিস্টেমটিকে সুশৃঙ্খল রাখা, নেটওয়ার্ক ডেটা ট্রাফিক ও ক্লায়েন্টের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে ক্লাউডকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে। ইহা প্রটোকল নামক কিছু নিয়মনীতি মান্য করে এবং মিডলওয়ার নামক ও প্রকৃতির বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করে। মিডলওয়ার নেটওয়ার্কে থাকা বিভিন্ন কম্পিউটারকে এক অন্যের সহিত যোগাযোগের সুবিধা করে দেয়। অধিকাংশ সময়ে সার্ভারসমূহ তাদের পূর্ণ ক্ষমতায় রান করে না, তার মানে সেখানে অব্যবহৃত প্রসেসিং ক্ষমতা নষ্ট হয়। এজন্য একটি হার্ডওয়্যার সার্ভার মেশিনকে অনেকগুলো আলাদা আলাদা সার্ভিসের সার্ভার হিসেবে কল্পিত মডেল দেয়া হয়, যেখানে প্রত্যকেটি সার্ভারের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম থাকে। এই প্রযুক্তিকে বলা হয় সার্ভার ভার্চুয়ালাইজেশন। একটি হার্ডওয়্যার সার্ভার মেশিনের কার্যক্ষমতাকে পরিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে ও তার আউটপুটকে বাড়িয়ে সার্ভার ভার্চুয়ালাইজেশন হার্ডওয়্যার সার্ভার মেশিনের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে।
যদি কোন ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভিস প্রোভাইডারের প্রচুর ক্লায়েন্ট থাকে এটা স্বাভাবিক যে সেখানে বিপুল পরিমাণ স্টোরেজ স্পেস প্রয়োজন হবে। কিছু কিছু কোম্পানীর নিজেদেরই শত শত ডিজিটাল স্টোরেজ ডিভাইসের প্রয়োজন হয়। ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে সমস্ত ক্লায়েন্টের ইনফরমেশনসহ ডেটা সংরক্ষণ করতে নূন্যতম এর প্রয়োজনের দ্বিগুণ সংখ্যক স্টোরেজ ডিভাইস রাখতে হয় কারণ যে কোন সময় অন্যান্য কম্পিউটারের মত এগুলোর কোন কোনটি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেম অবশ্যই সমস্ত ক্লায়েন্টের ইনফরমেশন সহ ডেটার অন্য একটি সেকেন্ডারি অথবা ব্যাকআপ স্টোরেজ নিশ্চিত করে। এই কপিগুলো সেন্ট্রাল সার্ভারকে শুধু মাত্র ডেটা পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাকআপ মেশিনে এক্সেস দেয় অন্যথা এগুলো এক্সেস করা যায় না। ব্যাকআপ এর মত করে এই কপি রাখাকে বলা হয় রিডান্ডেন্সী, যা প্রাথমিক সিস্টেমটি অকার্যকর হলে পুনরুদ্ধারের আগে পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের সাপোর্ট দেয়।
ক্লাউড কম্পিউটিং এর অ্যাপ্লিকেশন
বাস্তবে ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে অ্যাপ্লিকেশনের কোন শেষ নেই। একটি সাধারণ কম্পিউটার যে সব প্রোগ্রাম রান করতে পারে সঠিক মিডলওয়ারের দ্বারা ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেম তা সবই পারে। সাধারণ ওয়ার্ড প্রসেসিং কোম্পানীর জন্য ডিজাইন করা কাস্টমাইজ অপারেশন সফটওয়্যার সহ সমস্ত কিছুই এই ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে কাজ করে।
কেন কেউ একজন অন্য একটি আলাদা কম্পিউটিং সিস্টেমে প্রোগ্রাম রান করা বা ডেটা স্টোরিং কে নির্ভর বা বিশ্বাস করবে এখানে কিছু কারণ উল্লেখ করা হল-
ক্লায়েন্ট যে কোন সময় যে কোন স্থান হতে ডেটা ও অ্যাপ্লিকেশন এক্সেস করতে সক্ষম হবে। তারা ইন্টারনেট আছে এমন যে কোন কম্পিউটার থেকে ক্লাউড সিস্টেমকে এক্সেস করতে পারবে। ডেটা কোন একটি কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক বা কোন একটি কোম্পানীর অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এটি হার্ডওয়্যারের খরচ কমিয়ে আনতে পারে। ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে ক্লায়েন্ট সাইডে এডভান্সড হার্ডওয়্যারের চাহিদাও কমিয়ে দিতে পারে। আপনার বিপুল পরিমাণ মেমোরী বিশিষ্ট কোন দ্রুততম কম্পিউটার দরকার নেই কারণ মেমোরী ও প্রসেসিং ক্ষমতার যে চাহিদা নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশনের জন্য সেটা ক্লাউড সিস্টেমেই বহন করবে। তার থেকে আপনি একটি সস্তা কম্পিউটার টার্মিনাল কিনুন যাতে একটি মনিটর, কিবোর্ড, মাউসের মত ইনপুট ডিভাইস এবং ক্লাউড সিস্টেমে সংযুক্ত হবার জন্য ব্যবহৃত মিডলওয়ারটি রান করা মত পর্যাপ্ত প্রসেসিং করার ক্ষমতা আছে। আপনার সঠিক স্টোরেজের কোন হার্ডডিস্ক ও প্রয়োজন হবে না কারণ আপনি ক্লাউডে অবস্থিত দূরবর্তী কম্পিউটার সমূহেই সমস্ত ডাটা সংরক্ষণ করবেন।
বড় বড় কোম্পানীগুলো যারা কম্পিউটার ভিত্তিক কাজের উপর নির্ভরশীল তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিক সফটওয়্যারটি সেখানে নিশ্চিত করতে হয়। ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমে এসব অর্গানাইজেশনকে কোম্পানী ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। এই কোম্পানী গুলোকে প্রত্যেক কর্মীর জন্য এক গাদা সফটওয়্যার কিংবা সফটওয়্যার লাইসেন্স কেনার দরকার হবে না। তার বদলে কোম্পানীগুলো ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভিস প্রোভাইডারদের নির্দিষ্ট হিসেবে ফি প্রদান করতে পারে।
সার্ভার এবং ডিজিটাল স্টোরেজ ডিভাইসগুলো প্রচুর জায়গা দখল করে। কিছু কিছু কোম্পানী তাদের ডেটা সেন্টার সার্ভার রুমের জন্য আলাদা স্থান ভাড়া করে কারণ অফিসে পর্যাপ্ত এবং এগুলো চালানোর জন্য সুবিধাজনক স্থান হয় না। এক্ষেত্রে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক, হিমায়ন এবং ধুলোবালি প্রতিরোধের মত বিষয় সহ অগ্নি নির্বাপন/নিরাপত্তার বিষয়ও আছে। শুধুমাত্র কয়েকটি অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের জন্য এ বিশাল আয়োজন করা ও রক্ষা করে যাওয়াও কষ্টসাধ্য। ক্লাউড কম্পিউটিং এসব কোম্পানীকে তাদের বাহিরে সহজে অন্য কোথাও ডেটা স্টোরেজের সুযোগ করে দেয়। যা একটি ফিজিক্যাল সোর্স এ চাহিদা নিরক্ষণ করে। স্ট্রিমলাইনড হার্ডওয়্যার তত্ত্বে এখানে, ভিন্ন ভিন্ন রকম মেশিন ও ভিন্ন ধর্মী অপারেটিং সিস্টেমের দ্বারা গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কের তুলনায় সমস্যা অনেক কম হয়।
যদি ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেমের ব্যাক এন্ডটি গ্রিড কম্পিউটিং সিস্টেম হয় তাহলে ক্লায়েন্ট ক্লাউডে ব্যবহৃত নেটওয়ার্কটির প্রসেসিং ক্ষমতার সুবিধাটিও নিতে পারে। মাঝে মাঝে বিজ্ঞানী অথবা গবেষকগণ এমন এমন জটিল ক্যালকুলেশন নিয়ে কাজ করেন যা একটি সাধারণ কম্পিউটারের পক্ষে সম্পাদান করতে এক বছরও লাগতে পারে। গ্রিড কম্পিউটিং সিস্টেমে ক্লায়েন্ট ক্যালকুলেশনটিকে প্রসেসিং এর জন্য ক্লাউডে পাঠাতে পারে। ক্লাউড কম্পিউটিং সিস্টেম ব্যাক এন্ডের সমস্ত কম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতাকে একতে এনে ক্যালকুলেশনটিকে দ্রুততর করতে পারে।
ক্লাউড কম্পিউটিং এর উদ্বেগ
ক্লাউড কম্পিউটিং এর সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি হচ্ছে ডেটার নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা। অন্য কোম্পানীর দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ডেটার অধিকার দেয়াটা অনেকের কাছে উদ্বেগের বিষয়। কর্পোরেট কার্য নির্বাহীরা ক্লাউড কম্পিউটিং এর সুবিধা নিতে ইতস্তত বোধ করেন কারণ এই ব্যবস্থায় তারা তাদের কোম্পানীর তথ্য তালা বদ্ধ রাখতে পারে না।
এ অবস্থানের পাল্টা যুক্তি হিসেবে ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভিস প্রোভাইডাররা তাদের খ্যাতি বজায় রাখার স্বার্থে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। যা ফলশ্রুতিতে যেসব কোম্পানী এ সার্ভিসগুলো নেয় বা ক্লায়েন্ট তারা প্রোভাইডারদের কাছে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা পায়। তা’না হলে এই সেবা ব্যবস্থাটি তার ক্লায়েন্টদের হারাবে। ক্লায়েন্টদের ডেটার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়ার উদ্দেশ্যে সবচেয়ে অত্যাধুনিক ব্যবস্থা রূপায়ন করতে তারা খুব বেশী আগ্রহী।
গোপনীয়তা হল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি কোন ক্লায়েন্ট যে কোন স্থান থেকে লগইন করে ডেটা ও অ্যাপ্লিকেশন এক্সেস করতে পারে সেক্ষেত্রে এটা নিয়ন্ত্রনের জন্য ক্লায়েন্টের গোপনীয়তা নিয়ে বোঝাপড়া করা সম্ভব। ক্লাউড কম্পিউটিং কোম্পানীগুলোকে ক্লায়েন্ট গোপনীয়তা রক্ষার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। একটা উপায় হল প্রমাণকরণ প্রযুক্তি বা অথেনটিকেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেমন ইউজারের নাম এবং পাসওয়ার্ড আরেকটা হল অথোরাইজেশন ফরম্যাট বসানো যেখানে প্রত্যেকটা ইউজার শুধুমাত্র তার কার্য সম্পর্কিত ডেটা ও অ্যাপ্লিকেশনই এক্সেস করতে পারবে। এছাড়া ক্লাউড কম্পিউটিং নিয়ে কিছু অতিদার্শনিক প্রশ্ন রয়েছে। যেমন-
যেসব ব্যবহারকারী/কোম্পানী ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভিস গ্রহণ করে তারাই কি ডেটার আসল মালিক কিনা?
যারা ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভিস দিচ্ছে তারা কি স্টোরেজ এর আসল মালিক কিনা?
ক্লাউড কম্পিউটিং কোম্পানীর পক্ষে ক্লায়েন্টের ডেটার উপর ক্লায়েন্ট কে বাধা দেবার অধিকার আছে কিনা?
আইনগত অধিকার সংরক্ষণ করা নিয়ে প্রশ্ন সম্মতিসূচক (Compliance) ইস্যুগুলো রক্ষা করা।
বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, সেটার ক্ষেত্রে অপারেশনের নিশ্চয়তা কিভাবে রক্ষা হয়? কারণ ওপেন সোর্সের নিজেরই কোন মালিক/ নিশ্চয়তা নেই। যা ঝুঁকি নিরাপত্তা ও দায়িত্ব ক্লাউডের উপর বর্তায় ইন্ফ্রাস্ট্রাকচারের পরিবেশ গত ও পারিপার্শ্বিকতার সহিত সামঞ্জস্যতা বজায় রাখতে পারবে কিনা বা কতদিন পারবে ডেটা বা সিস্টেমের অপব্যবহার হবার কতটুকু সুযোগ আছে বা তার প্রতিরোধ কী?
ব্যবস্থার কোন আদর্শ বা গভর্ননেস আছে কি?
ক্লাউড কম্পিউটিং এ ডিপ্লয়মেন্ট মডেল
ডিপ্লয়মেন্টের ধরণের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের ক্লাউদ হয়ে থাকে-
- পাবলিক ক্লাউডঃ এ ক্লাউডে অ্যাপ্লিকেশন, স্টোরেজ এবং অন্যান্য রিসোর্স সমূহ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সকল সাধারণের পণ্য উন্মূক্ত করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সার্ভিসগুলো বিনামূল্যে কিংবা ব্যবহার অনুপাতে মূল্য প্রদান করে ব্যবহার করা যায়। সাধারণত Amazon Aws, Microsoft, Google এর মত পাবলিক ক্লাউড সার্ভিস সেবা প্রদানকারীরা নিজেই তাদের ইন্ফ্রাস্ট্রাকচারের মালিক এবং তারাই এটা পরিচালনা করে থাকে। শুধুমাত্র ইন্টারনেটের মাধ্যমেই এগুলো হতে সার্ভিস গ্রহণ করা সম্ভব। সরাসরি সংযোগের কোন সুবিধা এর দেয় না।
- প্রাইভেট ক্লাউডঃ এ ইন্ফ্রাস্ট্রাকচারটি কেবল মাত্র কোন একক অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে তাদের অভ্যন্তরীন ব্যবস্থায় বা তৃতীয় কোন প্রযুক্তি গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত এবং ইন্টারনাল ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠিত ডেটা সেন্টারে হোস্ট করা থাকে। কোন ব্যবসায়ী কর্ম পরিবেশকে ভার্চুয়ালাইজ করার জন্য কোন প্রাইভেট ক্লাউড প্রকল্পের দায়িত্ব নিতে কাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্তর জানা এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। এটি করার জন্য প্রতিষ্ঠানের উপস্থিত সম্পদ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত পুনর্বিচার করা প্রয়োজন। যখন এটা ঠিক মত সম্পন্ন হবে তখন ব্যবসায়ে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু প্রকল্পের প্রত্যেকটি স্তরে আসা নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সাথে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে গুরুত্বের সাথে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে গুরুতর দুর্বলতা গুলো এড়াতে/প্রতিরোধ করতে পারা যায়।
এটা সমালোচনায় আসে কারণ ব্যবহারকারীদের এখানে কিনতে হয়, বানাতে হয়, ব্যবস্থাপনা করতে হয় এবং ছোট খাট ম্যানেজমেন্টের জন্য এটা কোন উপকার হয় না। মূলত অর্থনৈতিক বিবেচনায় যে ক্লাউড মডেল তৈরি করে তা একটি কুচুটে ধারণা।
- কমিউনিটি ক্লাউডঃ কমিউনিটি ক্লাউড সমূহ একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ/গোষ্ঠীর যাদের নিরাপত্তা সম্মতি ও বিচার ব্যবস্থা একই তাদের মধ্যে ইন্ফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ার করে। মাঝে মাঝে অভ্যন্তরীণ ভাবে নিজেরা কিংবা বাহিরে প্রযুক্তি সেবায় এ ক্লাউড চলে। এটি নিজেরা ডেটা সেন্টার বানিয়ে অথবা প্রতিষ্ঠিত ডেটা সেন্টারে হোস্ট হয়ে থাকে। এত পাবলিক ক্লাউডের থেকে খরচ একটু বাড়লেও প্রাইভেট ক্লাউডের সুবিধার চিন্তায় অনেক কম খরচ হয়। ক্লাউড কম্পিউটিং এ খরচ কমানোর ধারণাটি এখানে পাওয়া যায়।
- হাই ব্রিড ক্লাউডঃ হাইব্রিড ক্লাউড সমূহ একাধিক পাবলিক, প্রাইভেট ও কমিউনিটি ক্লাউডের সমন্বয়ে গঠিত যার কিছু অনন্য সত্ত্বা থাকে কিন্তু তারা একসাথে স্থাপিত এবং একধিক স্থাপনার মডেল বেনিফিট প্রস্তাব করে।
ক্লাউডের সার্ভিস মডেল
ক্লাউড কি ধরনের সার্ভিস প্রদান করে বা ক্লায়েন্ট সমূহ কি ধরনের সার্ভিস এক্সেস করছে তার উপর নির্ভর করে সার্ভিস মডেল।
- IaaS- Infrastructure as a Service- এ ভার্চুয়াল মেশিন, সার্ভার, স্টোরেজ, লোড ব্যালেন্সার ও নেটওয়ার্ক অন্তর্গত।
- PaaS- Platform as a Service- এ এক্সিকিউশন রান টাইম, ডেটাবেইজ, ওয়েবসার্ভার ও বিভিন্ন ডেভেলপমেন্ট টুলস অন্তর্গত।
- SaaS- Software as a Service- এ CRM, email, ভার্চুয়াল ডেস্কটপ, কমিউনিকেশন টুলস, মেসেঞ্জার, গেমস ইত্যাদি পাওয়া যায়।
এ রকম আরো কিছু পাবলিক সার্ভিস মডেল হল-
- Storage as a Service (StaaS)
- Data as a Service (DaaS)
- Database as a Service (DBaaS)
- Test Environment as a Service (TEaaS)
- Desktop Virtualization
- API as a Service (APIaaS)
- Backend as a Service (BaaS)
ক্লাউড ও গ্রিড কম্পিউটিং এর পার্থক্য
গ্রিড কম্পিউটিং থেকেই মূলত ক্লাউড কম্পিউটিং এর ধারণা এসেছে। ক্লাউড কম্পিউটিং ওয়েব সার্ভিস এর দ্বারা কম্পিউটিং এ প্রয়োজন কে ইউজারদের মাঝে সম্পাদন করে- এখানে ক্লাউড একটি ইন্টারনেট গঠন করে। ক্লাউড ব্যবহার করে কোম্পানী সমূহ নতুন পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ ছাড়াই বিরাট মাপের কোন কাজ দ্রুততার সহিত সম্পাদন করতে পারে। ছোট ও মধ্যমমানের ব্যবসা সম্পূর্ণ তথ্য প্রযুক্তি সেবা ভিত্তিক করার এটি সাশ্রয়ী সমাধান।
অন্যদিকে গ্রিড কম্পিউটিং ডিস্ট্রিবিউটিং কম্পিউটিং এ ধারণা প্রস্তুত যেখানে নেটওয়ার্কে থাকা অসংখ্য কম্পিউটার একত্রে একই উদ্দেশ্যে চলে ও একই সমস্যা সমাধান করে। তার মানে একটি ইনস্ট্রাকশন অনেকে মিলে সম্পাদন করে। গ্রিড কম্পিউটিং সিস্টেম তৈরি হয়েছে মূলত হার্ডওয়্যার রিসোর্স সমূহকে শেয়ার ও একত্রীকরণ করে ব্যবহার করার জন্য যেখানে বিপুল ক্ষমতা প্রসেসিং ও মেমোরী প্রয়োজন হয় সেসব এক্সিকিউশন সম্পাদন করতে।
ক্লাউড কম্পিউটিং এ পরিকাঠামো গ্রিড সিস্টেম হলে এর সেবা ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। গ্রিড সিস্টেমে ক্লাউডের ব্যবহার বাধ্যতা মূলক নয় তেমনি ক্লাউডের পরিকাঠামোতে গ্রিড ব্যবহার করা প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে।
শেষ কথা
জুন ২০১১ এ ভার্সন ওয়ানের এক সমীক্ষাতে দেখা যায় ৯১% উর্ধ্বতন তথ্য প্রযুক্তি পেশাজীবিরা ক্লাউড কম্পিউটিং কি সেটাই জানে না। দুই তৃতীয়াংশ উর্ধ্বতন অর্থনৈতিক পেশাজীবিরা এর ধারণা রাখে তাও কারও রেফারেন্সে।
সেপ্টেম্বর ২০১১ এ আবেরদিন গ্রুপ এর সমীক্ষায় দেখা যায় সুশৃঙ্খল কোম্পানীগুলো ক্লাউড কম্পিউটিং এর জন্য গড়ে ৬৮% পর্যন্ত তথ্য প্রযুক্তিতে ব্যয় বৃদ্ধি অর্জন করেছে। এবং ১০% ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ খরচ কমিয়েছে।
ক্লাউড কম্পিউটিং এমন একটি প্রযুক্তি যেখানে ইন্টারনেট ও রিমোট সার্ভারের ব্যবহারে ডেটা এর বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন পরিচালিত হয়। ক্লাউড কম্পিউটিং ক্লায়েন্টের চাহিদা ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়সাশ্রয়ী উপায়ে তথ্য প্রযুক্তির সুবিধাগুলো দিয়ে থাকে। দ্রুত অগ্রসারতার কারণে অনেক কোম্পানী তাদের নিজস্ব ডেটা সেন্টার থাকা সত্ত্বেও তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক খরচ বহন করতে পারে না। ক্লাউড সেবা খরচ বাচিয়ে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ নতুন ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ না করে তথ্য প্রযুক্তি সেবার সামর্থ্য বাড়িয়ে তোলে। এ প্রযুক্তি কোম্পানীগুলোকে কেন্দ্রীয় স্টোরেজ, মেমোরী, প্রসেসিং ক্ষমতা ও ব্যান্ডউইথের দ্বারা অধিকতর দক্ষতার সহিত কম্পিউটিং এ সুযোগ দেয়।
এখন প্রশ্ন হল কারা এতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে? – গতানুগতিক সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন Oracle/SAP/Batch Baud/Lawson/ACCcom) ওপর চরম ভাবে এর প্রভাব পড়বে যদি ক্লাউড কম্পিউটিং এ প্রতিযোগীতায় টিকে যায়।
লেখকের নাম – কৃষ্ণেন্দু দাস
টেকনোলজি টুডে’র মাসিক পত্রিকায় প্রকাশের সময়কাল – জুন ‘২০১৪
