আজকাল ফেসবুকের কল্যাণে অসংখ্য অনলাইন শপ গড়ে উঠেছে। এর ভেতরে অনেক শপই ভালো ও উন্নতমানের প্রোডাক্ট বিক্রি করে জনগনণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে। আবার অনেকে ক্রেতাদেরকে বিভ্রান্তির ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করে চলেছে।
চলুন দেখা যাক প্রতারকেরা কি কৌশলে আঁকছে প্রতারণার ছক:
ফেসবুক পেইজে নজরকাড়া জামা-কাপড়ের বিজ্ঞাপন। দাম দেখে লোভ সামলানোই কঠিন। তবে শর্ত আছে। আগে বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্ট, তারপর প্রোডাক্ট ডেলিভারি। এবার পেমেন্টটা করা হয়ে গেলেই প্রতারণার জালে ফেঁসে গেলেন আপনি। সাথে সাথে ফেসবুক ও ফোন থেকে আপনি ব্লক।
ফেসবুকে বিজ্ঞাপন- আইফোন এক্স মাত্র ১৫৯৯ টাকা, স্যামসাং এস ৯ মাত্র ৩৫৫০ টাকা। যে আগে বুকিং দেবে সেই পাবে। মাত্র ৩টি ফোন বাকি আছে। একটুও দেরি না করে আপনি ঝাঁপিয়ে পড়ে বিকাশে পেমেন্ট করে দিলেন। আর তার পরই আপনার নম্বর ও আইডি ব্লক।
বিভিন্ন গেমের জন্য গোল্ড, লাইফ, স্কিল, লেভেল ক্রয়ের বিজ্ঞাপন দেয়া থাকে বিভিন্ন পেইজে। আপনি একজন গেমার আর তাই দরকার অনুযায়ী যোগাযোগ করলেন, আপনাকে বলা হলো আগে পেমেন্ট করতে। আপনি তাই করলেন।পেমেন্ট করা হয়ে গেলেই ব্লক।
অনলাইনে কেনাকাটা করতে, স্ক্রিল, নিটেলার, বিটকয়েন কেনার জন্য আপনার ডলার লাগবে কিংবা ডলারের বিপরীতে টাকা দরকার। ফেসবুকে খোঁজ করতে গিয়ে পেয়েও গেলেন মনের মতো একটা পেইজ। তবে শর্তটা আগের মতই, এডভান্স পেমেন্ট। পেমেন্ট দেয়া হয়ে গেলেই ব্লক।
শুধু অ্যাডভান্স পেমেন্ট নয়, ক্যাশ অন ডেলিভারিতেও আপনি আটকে যেতে পারেন প্রতারকের পাতা ফাঁদে। এক্ষেত্রে আপনার প্রোডাক্ট আসবে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে। আপনাকে গিয়ে কালেক্ট করে নিয়ে আসতে হবে। নির্দিষ্ট দিনে এসএ পরিবহন থেকে আপনাকে ফোন দেয়া হলো- আপনার প্রোডাক্ট এসেছে, নিয়ে যান। আপনি সেখানে গিয়ে প্রোডাক্টের মূল্য পরিশোধ করে প্যাকেট খুলে দেখলেন মোবাইলের পরিবর্তে এসেছে একটি ইট। আপনি সাথে সাথেই তাদেরকে উক্ত প্যাকেট ফেরত দিয়ে টাকা চাইলেন। কিন্তু তারা জানালো, এ প্যাকেজের সাথে রিটার্ন পলিসি না থাকায় এটি রিটার্ন নেয়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সেলারকে ফেসবুকে নক করতে গিয়ে দেখলেন আপনাকে ব্লক করে দেয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মাস্ক, পিপিই, গ্লাভস এর চাহিদা তো আমরা সবাই জানি। অনলাইনে প্রতারকেরাও ঠিক এই প্রয়োজনটাকেই টার্গেট করে করছে প্রতারণা।
অনলাইনে মটরসাইকেলের বিজ্ঞাপন। দেড় লক্ষ টাকার মটরসাইকেল মাত্র আশি হাজার টাকায় বিক্রি হবে। সামনাসামনি মটরসাইকেল দেখে কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রি-ইনস্টলমেন্ট ৫০০০ টাকা। এক্ষেত্রে ঘটনা ঘটতে পারে দুরকম। টাকা দিলেই আপনাকে হয়তো ব্লক করে দিতে পারে। অথবা টাকা দেবার পর সরাসরি ইন্সপেকশনের জন্য আপনাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আসতেও বলা হলো, আরও বলা হলো পছন্দ হলে সেখান থেকেই আপনার কাছে সেটি হ্যান্ডওভার করা হবে। আপনি টাকা ও আপনার একজন বন্ধুকে নিয়ে সে স্থানে যাওয়া মাত্রই ৫-৬ জন ব্যক্তি এসে আপনাদের ঘিরে ধরে আপনাদের কাছে থাকা টাকা, মোবাইল, মানিব্যাগ সব কেড়ে নিল। ভাগ্য খুব ভালো হলে সেখান থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসতে পারেন।
কিছু কিছু অনলাইন প্লাটফরম যেমন বিক্রয় ডট কম এ কেনাকাটার ব্যাপারে সাবধান থাকুন। এ ধরনের প্লাটফরম ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একটি সংযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে কেবল। এ প্লাটফরম প্রোডাক্টের কোয়ালিটি বা ক্রেতা/বিক্রেতার আইডেন্টিটি ভেরিফাই করে না। ডিল হয় সরাসরি ক্রেতা বিক্রেতার ভেতরে। ফলে কোনো ক্রেতা যদি প্রতারকের খপ্পরে পড়েন তাহলে এ প্লাটফরমের কিছুই করার থাকে না।
প্রতারক পেইজগুলোতে কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়-
তারা তাদের পেইজ অথেনটিক করার জন্য বিভিন্ন কাস্টোমার তাদের কাছে থেকে প্রোডাক্ট নিয়ে কতটা স্যাটিসফায়েড তার বিভিন্ন স্ক্রিনশট প্রদান করে থাকে।
তাদের প্রোডাক্টের মূল্য মার্কেট মূল্য থেকে অবিশ্বাস্য রকমের কম হয়।
নেটে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই দেখতে পাবেন এ সকল পেইজের বিজ্ঞাপন অন্য কোন পেইজ থেকে কপি করা।
প্রায় সকল ক্ষেত্রেই এডভান্স পেমেন্ট করার কথা বলা হবে। এক্ষেত্রে বিকাশ, রকেট ও নগদের মত মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিস ব্যবহার করা হবে। সাধারণত কোনো ব্যাংক একাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ডের পেমেন্ট ব্যবহার করা যায় না।
এ সকল পেইজগুলোর কোন শোরুম থাকে না ফলে চাইলেও আপনি শোরুম থেকে কেনাকাটা করতে পারবেন না। তবে অনেক ক্ষেত্রে শোরুম হিসেবে ভুয়া ঠিকানাও দেয়া থাকে।
পেইজগুলোর লাইকের সংখ্যা বেশ কম হয়। তবে বেশি লাইক দেখেই অথেনটিক পেইজ ভাবারও কোনো কারণ নেই। এমন অনেক পেইজ আছে যা তৈরি হয়েছিল কোনো নামকরা মডেল এর ফ্যান ক্লাব হিসেবে। ফলে দ্রুতই লাইকের সংখ্যা বেড়ে লাখ ছাড়িয়ে গেছে। পরে রাতারাতি ঐ পেজের নাম ও ছবি চেঞ্জ করে তা কোনো প্রোডাক্টের মার্কেটপ্লেসে রূপান্তরিত হয়েছে।
আসুন, এবার দেখি কি করে এই প্রতারকদের খপ্পর এড়িয়ে অনলাইনে কেনাকাটা করা যেতে পারে।
এ ধরনের ফ্রডের হাত থেকে বাঁচার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হচ্ছে এডভান্স পেমেন্ট দেবেন না।
ক্যাশ অন ডেলিভারির ক্ষেত্রে প্রোডাক্ট অর্ডার করার আগেই শিওর হয়ে নিন, কোন্ কুরিয়ার এর মাধ্যমে ডেলিভার হচ্ছে, তাদের রিটার্ন পলিসি আছে কিনা। শুধুমাত্র রিটার্ন পলিসি থাকলেই অর্ডার করুন। এবং কুরিয়ার থেকে প্রোডাক্ট রিসিভ করেই সাথে সাথে চেক করুন, সঠিক প্রোডাক্ট ডেলিভার করেছে কিনা।
যে পেইজ থেকে কিনছেন সে পেইজের সকল রিভিউ পড়ে দেখুন কেউ কোনো বিরূপ মন্তব্য করেছে কিনা। সাধারনণত ফেইক পেইজের এডমিনরাই তাদের বিভিন্ন ফেইক আইডি থেকে ভালো ভালো রিভিউ দিয়ে রাখে। তবে ভালোভাবে চেক করলে প্রতারিত ভিকটিমের রিভিউও পেয়ে যাবেন।
সবচাইতে যেটি মনে রাখা বেশি জরুরি তা হচ্ছে নিজের বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করা। কমদামে ভাল প্রোডাক্ট অফার করলেই তা কেনার চেষ্টা না করে আগে চিন্তা করে দেখুন এই দামে এ কোয়ালিটির প্রোডাক্ট তৈরি ও বিক্রি করা সম্ভব কি না।
আর প্রতারিত হলে-
চুপচাপ না থেকে আইনি সহায়তা নিন।
অপরাধীদের গ্রেফতারে সাহায্য করুন। আপনি প্রতারিত হলেও প্রতারকের বিরুদ্ধে আপনার অ্যাকশন হয়তো আরও সম্ভাব্য অনেক ভিকটিমকে প্রতারকদের হাত থেকে বাঁচাবে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইনে প্রকাশিত যে কোনো ধরনের গুজবসহ যেকোনো সাইবার অপরাধের তথ্য সিআইডির সাইবার পুলিশের সাথে শেয়ার করুন । এ ইউনিটের সাথে যোগাযোগের জন্য নিম্নোক্ত যেকোনো মাধ্যম ব্যবহার করে যেকোনো সময় যোগাযোগ করতে পারেন।